Share with your friends

bangla golpo রণ ও রক্ত(part-1)

রাজধানীর রাজপথে দুই পক্ষের সংঘর্ষ…ইট পাথরের অবিরাম এলোপাথাড়ি বর্ষণ…বোঝা যায়না কে কার বিপক্ষে…সবাই একই রকম…অদূরে একটি পাঁচিল ঘেঁষে কিছু যুবক এক যুবককে মারতে থাকে- মার খেতে খেতে রক্তাক্ত যুবক জ্ঞান হারায় …পুলিশ খানিক অসহায় খানিক অবশ এবং অনেকটাই নিস্ক্রিয়…হঠাৎ একটা গুলি চলার শব্দ… এক কনস্টেবল এর বা কাঁধ ফুঁড়ে ঢুকে গেলো শরীরে…মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি…চিৎকার শোনা যায়-“রতনজি জখমী হ্যায় গাড়ি লে আও”…বাড়িঘর দোকান জ্বলতে থাকে…প্রবল আক্রোশে শোনা যায় “হিন্দুয়কা হিন্দুস্তান”… “জয় শ্রী রাম”…

বসন্তের স্নিগ্ধ সকাল- ফোন বাজছে-এক যুবক এসে ফোন ধরে

-হ্যাঁ রণ বলছি..হ্যাঁ বিকাশ দা বলো…হ্যাঁ এই কাগজে পড়লাম…হম জাফরাবাদের ওখানেই…না বলছে তো কালই নাকি ওখানকার মহিলারা রাস্তা অবরোধ করেন- ধর্ণায় বসেন…হ্যাঁ রাতে নাকি কারা লরি বোঝাই পাথর ফেলে দিয়ে গেছিল আগে নাকি ওখানে এত পাথর ছিল না…হম রাতারাতি…হ্যাঁ তিনজন মৃত এখনো পর্যন্ত তার মধ্যে গোকুলপুরীর হেড কনস্টেবল রতনলালও আছেন…হ্যাঁ বিকাশদা আয়রণিটা ওখানেই  কে যেআসলে কোন দিকে সে কি আর বোঝা যায়…মানুষগুলো যে সবাই এক দেশ এক নেতার…কি তাই না…(ওপ্রান্তে কিছু শুনে হেসে ওঠে রণ) হ্যাঁ ঠিক আছে চলো রাখছি…দেখা হবে রবিছায়ায়।

(রণ ফোন রেখে ঘুরে দেখে বাবা এসে দাঁড়িয়েছে)

-কিছু বলবে?

-হম…বলছি এইযে  এই নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে এরকম হিংসা চলছে এটা করার মানেটা কি…আজকাল কি এরা কিছুই খোঁজ করে না শুধু যে যেমন হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয় ভেসে চলে? এরা কি জানে না যে আসামের অনেক হিন্দু পরিবারেরও অস্তিত্ব বিপন্ন এমনকি খোদ আসামের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরও নাম আছে তালিকায়…তাছাড়াও দিল্লিতে অভিজাত শিক্ষিত এমন অনেক মানুষ আছেন যারা এর অন্তর্ভুক্ত এবং তারা হিন্দু তাহলে হঠাৎ হিন্দু দেশ মুসলিম তাড়াও এই রবটা উঠলো কেন? এত রক্তপাত কেন?

-রক্তপাতের এখনো অনেক বাকি বাবা…মানুষের ক্ষোভ,যন্ত্রনা, উদ্বেগ মন্থনে বারবার এমন রক্তই উঠে আসবে…আর নির্বাচিত শাসকের দাম্ভিক হৃদয়হীনতার দায় তো নিতেই হবে আমাদের…(শুকনো হাসে)(বেরিয়ে যেতে যায়)

-শোন(রণ ঘুরে তাকায়) তুই একটু সাবধানে চলিস…(রণ সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়ে বলে ‘বকুলপুরে এত ভাবনা কি!’ যায়…বাবা তাকিয়ে থাকেন রাস্তার দিকে)

bangla golpo রণ ও রক্ত(part-1)

একটি ঘিঞ্জি এলাকার মধ্যে একটি বাড়ি…ম্লান হলুদ আলো জ্বলছে…টিভি চলছে সামনে এক দম্পতি ও দুই ছেলে মেয়ে

(নিউজ চলছে- আতঙ্কে কাঁপছে দিল্লি ২৭ জন নিহত…হয়েছে এসিড হামলাও…চারটি জায়গায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে…২০০ জনের বেশি আহত…৪৬ জনের শরীরে মিলেছে বুলেটের ক্ষত…)

-কিগো এইসব যা দেখছি …ইলিয়াস বলছিল আমাদের বকুলপুরেও এসব হচ্ছে এদিকওদিক…এই শোনো আর বেরোতে হবে না চাল ডাল আছেওই একটু একসাথে করে নেব।

– আহ! না রাবেয়া ওসব ঐদিকে হচ্ছে আমাদের এখানে সেরকম কোনো ভয় নেই যদিও..(থমকে যায় ছেলে মেয়ে দুটোর দিকে তাকায়) সারাদিন বেরোইনি ওরা পড়াশোনা করছে একটু ভালো কিছু তো খেতে হবে নাকি যাই চারটে ডিম অন্তত নিয়ে আসি আর একটু ফিরনি…কি মেহবুব চলবে তো…

(মেহবুব কিছু বলতে যাওয়ার আগেই বোন বাবার কাছে দৌড়ে আসে)

 – আব্বা আমার জন্য আইস ক্রিম।

-আচ্ছা বেটি আনবো…রাবেয়া দরজাটা দিয়ে দাও।

(খানিক সংশয় নিয়ে রাবেয়া তাকিয়ে থাকে শোহর এর চলে যাওয়ার দিকে তারপর দরজা বন্ধ করে দেয়)

বাজারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ভীষণ শোরগোল শোনা যায়…কিছুক্ষণ এর মধ্যে তা কাছে চলে আসে…হঠাৎ একটা গুলি ছুটে এসে বিঁধে যায় নূরের পায়ে…রক্ত বন্ধ হয়না…

সন্ধ্যে নেমেছে…আজানের সুর মিশছে বাতাসে শঙ্খধ্বনির সাথে…একটা ছিমছাম ঘর…কয়েকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে…ঝকঝকে এক তরুণ ফোনে স্ক্রল করছে

-চিনে এই ইরোনা ভাইরাসটা তান্ডব চালাচ্ছে দেখছি…

-হম…যা দেখছি ভয়ঙ্কর অবস্থা…ইভিড ২০ বলে যেটা ছড়াচ্ছে ওরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কিছুতে…সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে…

-সোহম বকুলপুরেও কাল যেটা ঘটেছে সেটা কি কম ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে তোমার?

-না বিকাশদা সেটা নয়…সকালে ঘটনাটা শুনে মনটা কেমন দমে গেছে…এই ছাগল অম্লান এফবি করাটা বন্ধ করনা অন্তত রবিছায়ায় এসে তো…

-সোহম এইটা থেকেই তো খবর পাচ্ছি…মুস্তাফাবাদে কিছুজনের চোখে এসিড জাতীয় কিছু ঢালা হয়েছে ৪ জন অন্ধ…এত শালা সেই গঙ্গাজল কেস…আচ্ছা বিকাশ দা রাজধানীর বুকে এমন নৃশংস কাজ চলছে প্রধানমন্ত্রী এখনো নীরব…

-নির্মম নীরবতায় যে নিটোল অবজ্ঞা থাকে সেটা বোঝ অম্লান?( সবাই ঘুরে তাকায়…ঘরে এসে ঢুকেছে রণ)…সারা দুপুরটা ইলিয়াসের সাথে কাটলো ছেলেটা ভালো জানো বিকাশদা…অসহায় হয়ে পড়েছে ভীষণ…

(সজল জিজ্ঞাসু হয়)-ইলিয়াস?

রণ- ইলিয়াস নূর মোহাম্মদ এর ভাই…কাল রাতে পায়ে গুলি লেগে রক্তশূন্য হয়ে রাস্তাতেই যাকে মরতে হয়েছে…একটু আগে গোর দিয়ে এলাম…তাই দেরি হলো।

সুনয়না আর তিথি চা নিয়ে ঢোকে…সবাই চা নেয়… খানিক নীরবতা…

bangla golpo রণ ও রক্ত(part-1)

বিকাশ- ওনার ছেলে মেয়ে আছে তো রণ?

রণ- হ্যাঁ এক ছেলে মেহবুব আর মেয়ে জাহানারা…মেহবুব সবে মাধ্যমিক দিলো আরে মেয়ে এইটে পড়ে। আমি আপাতত ইলিয়াসকে কথা দিয়ে এসেছি ওদের পড়াশোনা নিয়ে ভাবনার কারণ নেই…রবিছায়া দায়িত্ব নেবে।(বিকাশের দিকে তাকায়)

বিকাশ- ঠিকই করেছ…আমাদের এখানে এমন কিছু ঘটে যাবে ভাবিনি।

রণ-আগুন একবার ছড়ালে সে ছাই না করা অবধি থামে না।

তিথি- বাইরে অবস্থাটা কেমন যেনো ভয় ভয় আতঙ্কের হয়ে গেছে হঠাৎ।

সুনয়না- হ্যাঁ আমাদের বাড়ি কাজে আসে আমিনাদিদি আজ কেমন শূন্য দৃষ্টিতে মায়ের দিকে দেখছিল…মা বললো কিছু ভয় নেই আমিনা আমরা তো আছি সাবধানে থাকো প্রয়োজনে বলতে দ্বিধা করো না।

সজল- দিল্লিতে দলে দলে ওরা ঘর ছাড়ছে আমাদের এখানেও কি তবে তাই হবে?

অম্লান- না সেটা যাতে না হয় তার খানিক দায়িত্ব আমাদেরও নিতে হবে।

বিকাশ- মুখ্যমন্ত্রী নির্মলা দেবী এখনো অবধি কিছু বলেননি। রণ তোমার সাথে কি যোগাযোগ হয়েছে ওনার?

রণ-না এভাবে এই সময় উনি কিছু বলবেনও না…

সোহম- হিংস্র জনতার মাঝে কাকে কি বলবে বিকাশদা …হঠাৎ এত অসহিষ্ণু কেন হয়ে উঠছে সবাই আর এত অস্ত্রও যে কোথা থেকে আসছে…এভাবে মারছে…দয়া বলে কিছু নেই এদের…

রণ- দয়া বা অনুকম্পার কথা নয় সোহম…এ আস্ফালন ক্ষমতার…বুঝিয়ে দেওয়ার যে দেখো আমি শাসন করবো…সব আমার নিয়ন্ত্রণে…তার কানে কিছুই পৌঁছবে না কারণ ক্ষমতা স্বভাবতই বধির।

বিকাশ- এফ আই আর কি হয়েছে? নাকি এখানেও দিল্লির মতো গোটা শহর পুড়ে ছাই হলে তবে এফ আই আর হবে?

রণ-না আমি আজ ইলিয়াসের সাথে গিয়ে এফ এই আর করে এসেছি…আমি না গেলে হয়তো…

সুনয়না- রণদা ঘৃণা আর হিংসার আগুন ঠিক কতটা ছড়ালে আমাদের বাড়ির দোরগোড়ায় এসে পৌঁছবে…ভয় করছে খুব …ঘৃণার অস্ত্রকে একেবারে সামনাসামনি দেখার ভয়।

তিথি- আর আমাদের গণমাধ্যমে প্রশিক্ষিত মন…বুঝে উঠতেও পারবোনা কখন যুক্তি-তর্ক-দৃশ্য-প্রমাণের উপর বিদ্বেষের পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে আর ওত পেতে আছে শুধু একটা হিংস্র ভিড় যারা অসম্মতির চিহ্ন দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিঁড়ে খাবে(সুনয়না চেপে ধরে তাকে শান্ত করে)

বিকাশ- আমরা ভুলে থাকার সময়ে রয়েছি তিথি…বিবিধতা-ভিন্নতার স্বীকৃতি শুধু কাল্পনিক ব্রাত্য ভাবনা-অর্থনৈতিক দুরবস্থা- খিদের জ্বালা এসব ভুলে – ভুলিয়ে রাখার একটা সুপরিকল্পিত রাজনীতি- রাষ্ট্রবাদের নামে যে বীজ বপন করা হয়েছে এবং গেলানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত এ হিংসা তারই পরিণাম…বিদ্বেষের বিষ যত ছড়াবে তত সহজ হবে শত্রুপক্ষ খুঁজে নেওয়া-দেশ জুড়ে যুবরক্তকে ভীষণ সংগঠিত ভাবে খেপিয়ে তোলা হচ্ছে ধর্মের নামে- সত্তাপরিচিতির নামে- কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অবলীলায় বলছেন গোলি মার শালোকো…হ্যাঁ তিথি ভয় করবে না ভয় তো করবেই-ঘৃণার রাজনীতিকে তার শত্রু খুঁজে নিতে হবেই…প্রানের ভয়ে আমরা আজ বাধ্য নিজের আত্মসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের ধর্মপরিচিতি খুলে দেখাতে…এই হিংসা ভীষণ সত্য…

রণ-আর তাই ভয়টা এত তীব্র…ইলিয়াস বলছিল জাফরাবাদে একটা দশ বাই দশ ঘরে কোনরকমে আতঙ্কে চুপ করে রয়ে গেছে ওদের এলাকার ১১ জন…সব দিনমজুর…আড়াই দিন কোন খাবার জোটেনি…জানলার বাইরে শুধু পুলিশের ভারী বুটের শব্দ…কাল রাতে ঘণ্টা খানেক ইন্টারনেট চালু হয় তাই খবর পেয়েছে…আজ গেছিলাম যখন ওদেরই একজনের মা দাওয়ায় বসে ছিল…চোখের জল শুকিয়ে গেছে…উনুন জ্বালাননি দুদিন…যে বাড়িতে বাচ্চা গুলো আছে তাদের খাওয়ার দেখাশোনা করছে ইলিয়াস আর কজন মিলে…

bangla golpo রণ ও রক্ত(part-1)

সোহম- শুরু হবে ঠিক এরপর…

অম্লান- মানে?

সোহম- এখন অনুচ্ছেদ,

মাথা কাটা সব আশার বিপরীতে

আহত কোনো চতুস্পদের মতো

শোয়ানো মেরুদণ্ডের হিংস্রতা নিয়ে

আপাতত অপেক্ষা করছি দুহাতে

নির্জন দীর্ঘশ্বাসে লেগে আছে

সজল-রক্তছিটে!

রণ-ভয়ের সাম্যবাদ ধূসর বিপনী জুড়ে ভেসে আছে

ভাসমান লাশের মতো মৃত,পচা…

(তীব্র শব্দ হয় জানলার কাঁচ ভেঙে ঘিরে কিছু এসে পড়ে)

(অম্লান দৌড়ে যায় একটা পাথর কাগজে মোড়া…কাগজ এর মোড়ক খুলে কিছু একটা পড়ে থমকে যায়)

রণ- এই কি লেখা ওতে?

অম্লান- এফ এই আর টা করা ভালো হলো না রণজয় চৌধুরী

ক্ষতি হয়ে যেতে পারে

(রণ দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়)

Hope you liked the first part of bangla golpo রণ ও রক্ত.

Click here to read the second part.

To read more exciting creative stories click here.

Happy Reading !!

4+

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *