Share with your friends
সব চরিত্র কাল্পনিক

সব চরিত্র কাল্পনিক -পুরোনো জং ধরা কলকব্জা সমেত কাঠের মোটা দরজাটা খুলতে বেশ বেগ পেতে হলো অন্তহীনকে। এতো বছর ধরে পড়ে থাকা বন্ধ দরজা। এদিকটা তেমন কেউ আসে না। আসলে অন্তহীন কাউকে আসতে দ্যায়ে না।ঘরটা অন্ধকার, বহুকালের ধুলোর স্তর পড়ে আছে মেঝেতে। দরজা দিয়ে ঢোকা আলোতে বহুকালের নিস্তব্ধ গম্ভীরতা আড়মোড়া ভেঙে যেন চোখ খুললো।  ঘরটার বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কয়েকটা বাক্স পড়ে আছে। তাতেও ধুলো, ঝুলের স্তুপ। বেশ কিছুক্ষণ ঘরটার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো অন্তহীন। আদৌ কাজটা কি ঠিক করলো! কি দরকার ছিল এতদিনের পুরোনো জিনিস নিয়ে নাড়াঘাটা করতে যাওয়ার!এইসব চিন্তা করতে করতে আনমনে একটা বাক্সের দিকে এগিয়ে গেল অন্তহীন। আসলে এই দীর্ঘ ৪৫ বছরে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল সেটা ভাবার অবকাশ পেয়ে ওঠেনি। ছেলেবেলা, স্কুল, কলেজ, চাকরি, সংসার এত কিছুর মাঝে ভাবতে ভুলে গেছিল। ৪৫ টা বছর আসলে মুহূর্ত ছিল একটা।


বাক্সটার ওপরের ধুলো ঝেড়ে ঢাকনাটা খুলতে গেল অন্তহীন। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের ঘটনা গুলো বদলাতে শুরু করলো। কেউ যেন ওকে এক টান মেরে সেই আলো আঁধারীর ঘর থেকে এক ঝকঝকে রোদের মাঝে ফেলে দিলো। চোখে রোদের আলোটা সামলে ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগলো। চশমাটা ঠিক করে চারপাশে তাকালো। খোলা মাঠ, মাঠের ধারে একটা বিল্ডিং। সেই আগের মতোই আছে, শুধু নতুন রঙ করা হয়েছে। মাঠের একটা দিক এখনো নেড়া, কোনো ঘাস জন্মায়নি। বিল্ডিংয়ের পাশের অডিটোরিয়ামটা একটু পুরোনো লাগলেও ওর কাছে ওটা নতুন। ও পাস করে বেড়িয়ে যাওয়ার পরে ওটা পুরোপুরি কমপ্লিট হয়েছিল। বড়োবাড়ির গেটটা একই আছে। দুতলায় উঠে বাঁদিকে সোজা এগিয়ে গেল। জানলাতে আজও কাঁচ নেই। ওই তো সেই বেঞ্চের ধার। ওর পাশে বসতো স্পন্দন আর তার পাশে অতনু। সামনে সুধাংশু আর পেছনে কাকাবাবু। ঘরটার পেছন থেকে লাইব্রেরি আর কম্পিউটার বিল্ডিংটা দেখা যায়। সেদিক থেকে ঘুরে এসে হেডস্যারের রুমের দিকে গেল। নাঃ, নতুন স্যার। টিচার্স রুমের কেউ চেনা নেই। খেলার জিনিস গুলো একদিকে পড়ে আছে। ভাঙা আর গোটা কতগুলো উইকেট আর সঙ্গে ব্যাট, ফুটবল, ভলিবল। মাঠের ধারের রাস্তার দিকে তাকাতেই একজন চেনা লোককে দেখতে পেল। আরে! বাহাদুরদা নাঃ! মাথার চুলগুলো সাদা হয়েছে। চেহারাটা ভেঙে গ্যাছে! ধীরে ধীরে হাঁটছে।

সব চরিত্র কাল্পনিক

ও চিৎকার করে ডাকলো, “আরে বাহাদুরদা! কেমন আছো!”। আশ্চর্য! লোকটার কানটাও গ্যাছে নাকি! শুনতে পেল না। আগের মতোই হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল। পেছন পেছন ছুটতে লাগলো অন্তহীন, ঠিক বাহাদুরদার কাঁধটা ছুঁতে যাবে! আবার আগের মতো সব ঘেঁটে গেল! চারিদিকটা ঘুরতে লাগলো! মাথার ভেতর সব গুলিয়ে গেল। কেউ যেন ওকে তুলে আছাড় মেরে ফেললো। চোখ খুললো অন্তহীন।  জায়গাটা খুব চেনা চেনা লাগছে। চিনতে পারছে না। চারিদিকে বিল্ডিং, ফ্ল্যাট গিজগিজ করছে। রাস্তায় প্রচুর গাড়ি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চারিদিক। পেছনে ঘুরে চমকে উঠলো। মনে পড়েছে! একটা সময় পর্যন্ত চিরকাল এই জায়গাটা ঘৃণা করে এসেছে। রাগতে গিয়েও রাগতে পারলো না কলেজটা দেখে! এগিয়ে গেলো। এন্ট্রান্স হলে ঢোকার সময় কেউ আটকালো না ওকে। আইডি চাইলো না। কেউ তাকালো না পর্যন্ত! অদ্ভুদ! ঢুকতেই হল অফ ফেমের পোস্টার! অনেক চেনা মুখ দেখতে পেলো! ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। নাঃ, আপাতত কোনো চেনা মুখের প্রফেসরকে দেখতে পেল না। সিঁড়ি দিয়ে উঠে কি মনে হতে দরজায় লাগানো “রেজিস্টার” ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল! নাঃ, পাল্টে গ্যাছে। এখন নতুন রেজিস্টার। ভদ্রলোককে দেখে খুব শান্ত মনে হলো।

মনে মনে হাসলো। ওদের রেজিস্টারের আমলে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত। লাইব্রেরীটা বেশ পাল্টে গ্যাছে! ক্যান্টিনের সেই চেয়ার টেবিল, আড্ডার লিস্টের নাম গুলো কে ফোন করে ডাকা- এই তো সেদিনের সব কিছু। লাস্ট সেমে ও ক্লাসে কম আর ক্যান্টিনে বেশি সময় কাটিয়েছিল। হঠাৎ করে একটা নাম মনে পড়তে ও দৌঁড়ে গেল! B1 LG 1.3 ECE 3C। দৌঁড়ে গেল। নাঃ, এটার ডিপার্টমেন্ট চেঞ্জ হয়েছে। এখন CSE 2P। মরুক গে! ক্লাস চলছে। ঢুকবে কি ঢুকবে না ভাবতে গিয়েও দরজাটা খুলে ফেললো। প্রফেসর এসে বন্ধ করে দিলো। এবার খুব রাগ হলো ওর। কি বাজে ব্যবহার! কিছু বলতে না দিয়ে মুখের ওপর কেউ ওরকম দরজা বন্ধ করে! বেশ জোরেই দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে গেলো। “বড্ড হাওয়া তো আজ!” প্রফেসর বিরক্ত হয়ে দরজাটা আবার লাগিয়ে দিলেন। অন্তহীন ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো চেয়ার গুলোর দিকে। জানলার ধারের দিকে। এটা এককালে ওর পার্মানেন্ট জায়গা ছিল! চেয়ারটায় তাকালো। পাল্টে দিয়েছে। এটায় কোনো নাম নেই। কিন্তু ওর লেখা চেয়ার টা কি ফেলে দিলো ওরা! পাগলের মতো সব কটা চেয়ার উঁকি দিতে লাগলো। নেই নেই! কোথাও কোনো নাম নেই। কিছু চেয়ারে ছেলে মেয়ে গুলো বসে আছে। তাদের ধাক্কা দিয়ে সরাতে গেল। সরে যাওয়া তো দূর,কেউ নড়লো না। ধপ করে মেঝেতে বসে গেল অন্তহীন। একটা কষ্ট বুকের ভেতরে পাক খেতে থাকলো। কলেজ ছাড়ার পর কেউ তো কোনো যোগাযোগ রাখেনি। ও তো চুপচাপ চলে গেছিলোই, শর্মিলাও কোনো যোগাযোগ রাখেনি। নামটা মনে পড়তেই আরেকটা ঝটকা, ক্লাসরুমটা সরে যাচ্ছে! চেয়ারগুলো শূন্যে উড়ছে। ও চোখ বন্ধ করে নিলো আরেকবার।

সব চরিত্র কাল্পনিক

চোখ খুললো এক বিকেলে। হালকা শীত শীত লাগছে! গায়ে একটা পাতলা পাঞ্জাবি পড়ে থাকায় বেশ ঠান্ডা লাগছে। উঠে দাঁড়ালো! এটা একমাত্র একই আছে। আসলে সরকারি জায়গায় কে এতো জঙ্গল সাফ করবে! যা ছিল তাই আছে! ওই তো ঢুকতেই ডানদিকে একটা পুকুর। এদিকে বাঁধানো রাস্তা। দু তিনটে কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। আজ নাম সই করে ঢুকতে হবে না সেটা বুঝতেই পেরেছিল এতক্ষণে! আস্তে আস্তে বাঁধানো রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল। রেডিওর টাওয়ার গুলো একই আছে। স্টুডিওতে ঢুকে সেই AIR এর কোনো চ্যানেলের প্রোগ্রাম শুনতে পেল। জোড়ালো AC তে হাত পা জমতে লাগলো। সেই ভদ্রলোক কি আর আছেন! অল্প চুল, মধ্যবয়স্ক, চোখে চশমা। বেশ sarcastic ছিলেন ভদ্রলোক। ফাঁকা রাস্তাটা বেশ আছে। চারপাশে বেশ ঝোপঝাড় আগের মতো। একবার হেঁটে এলো। কাঁটাতারের পাশের জমির ভেতরের সেই রাস্তাটা কি আর আছে! যেটা দিয়ে গেলে একটা বিশাল গাছ আর ডোবায় এসে রাস্তাটা থামত। এগিয়ে গেল, নাঃ বড্ড ভাঙা রাস্তা। আর যাওয়া যাবে না। তবে সেই উঁচু ঢিবিটা আছে। যেটার ওপর ওরা দুজনে বসে গল্প করতো। আস্তে আস্তে All India Radio এর আমতলার অফিসের এর গেট থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে লাগলো। কিছুটা রাস্তা গিয়ে দেখল বাঁ দিকে একটা রাস্তা নেমে গ্যাছে।

ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো, এটা আর একটা ব্রাঞ্চ, নাম চণ্ডী। এখানে ওদের শেষ সপ্তাহের ট্রেনিং ছিল। শেষ দু তিনদিন পাগলের মতো ফটো তুলেছিল  শর্মিলা। লাস্টে অন্তহীন অপেক্ষা করতে করতে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। শর্মিলার ফটো তোলা শেষ হতে হতে সেদিন সন্ধ্যে হয়ে গেছিল। একটু বিরক্ত হয়েছিল অন্তহীন। “রাগ করলি!” আদুরে গলায় হাত ধরেছিল শর্মিলা। “না, রাগ না। আজ শেষ দিন, একটু সময় কি আমার জন্য রাখা যেত না! আমাদের আর দেখা হবে কিনা জানি না!”। সব প্রশ্ন আটকে গেছিল বাসে ওর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া মুখটার সামনে। অন্তহীনের হাত তখনও ওর হাতের মাঝে। সেই মুহুর্তটা অন্তহীন থামাতে চেয়েছিল। চোখের ওপর পড়া চুলগুলোকে হাত দিয়ে সরিয়ে দিতো গিয়েও দ্যায়নি। ভালো লাগছিলো সেদিন তাকিয়ে থাকতে।

একটা আনমনা বাচ্ছা মেয়ে করুণ মুখে ঘুমাচ্ছিল। জাগাতে ইচ্ছে করেনি। সেই বাস থেমে থাকেনি। তারাতলায় নামার আগে ডাকতে বড়ো মায়া লেগেছিল অন্তহীনের। বাস থেকে নামিয়ে হাত ধরে রাস্তা পাড় করে সেদিনের মতো থামিয়ে দিয়েছিল স্বপ্নমাখা বাস্তব। বড্ড চঞ্চল ছিল । রাস্তায় একা ছাড়তে ভয় লাগতো। শর্মিলাও ওর রাস্তায় থেমে থাকেনি। ফিরে গেছিল ওর অতীতে। ওর প্রেমের কাছে। খুব কষ্ট হয়েছিল অন্তহীনের। পারেনি ওকে কিছু বলতে। গড়িয়াহাট থেকে নন্দন বা কলেজ স্ট্রীট থেকে ময়দানে যে অল্প সময় ওরা কাটিয়েছিল সেটাই একমাত্র সম্বল ছিল ওর কাছে। আকাশবাণী ভবনের সমাচার মুলতুবি রেখে দিয়েছিল ওর সেই দরজা বন্ধ ঘরের বাক্সতে। বাক্সের কথা মনে পড়তেই মুহুর্তে ও ফিরে এলো সেই ঘরে! আনমনে অনেক কিছু ঘেঁটে ফেলেছে। শর্মিলার অনেক পুরোনো ছবি, ওদের ফটো, কলেজ, স্কুল সহ আরো অনেক কিছু।

“দাদাবাবু, চা দিয়ে গেলাম। দিদিমণি আপনাকে একবার নীচে ডাকছে!” তন্দ্রাটা কেটে গেল কাজের মেয়ের ডাকে। খেয়াল নেই কখন চেয়ারে বসে বসে হাতে বই নিয়ে চোখটা লেগে গ্যাছে। চশমাটা পড়তে গিয়ে বুঝতে পারলো চোখের কোণটা একটু ভিজে। বইটা খুলে রেখেই নিচে নেমে গেল অন্তহীন। শেষ পাতাটাতে কবিতার শেষ অংশ-

“….মোর লাগি করিয় না শোক-
আমার রয়েছে কর্ম রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শুন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠে আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সে ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপক্ষ হতে আনি
রজনী গন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে
সে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করূন মুহূর্তগুলি গন্ডুষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম,
ওগো নিরূপম,
হে ঐশ্বর্যবান
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান,
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।”

Hope you like our short story সব চরিত্র কাল্পনিক. Let us know your thoughts in the comment section below.

0

23 thoughts on “সব চরিত্র কাল্পনিক – A Bengali Short Story”

  1. We are a bunch of volunteers and opening a brand new scheme in our community.

    Your website offered us with useful info to work
    on. You’ve performed a formidable process and our entire community will probably be grateful to you.

    0
  2. Hello! This post couldn’t be written any better! Reading this post
    reminds me of my previous room mate! He always kept chatting about this.
    I will forward this page to him. Pretty sure he will have a good read.
    Many thanks for sharing!

    0
  3. You are so interesting! I do not suppose I have read through anything like that
    before. So nice to find another person with original thoughts on this subject.
    Really.. thank you for starting this up. This site is one thing that’s needed on the internet, someone with a little originality!

    0
  4. I do not know if it’s just me or if everybody else encountering problems with
    your site. It appears as though some of the written text in your posts are running off the screen. Can somebody else please comment and let
    me know if this is happening to them too? This could be a issue with my web
    browser because I’ve had this happen before. Cheers

    0
  5. Hi would you mind letting me know which hosting company you’re utilizing?

    I’ve loaded your blog in 3 different web browsers and I must say this blog loads
    a lot quicker then most. Can you recommend a good hosting provider at a honest
    price? Thanks a lot, I appreciate it!

    0
  6. Please let me know if you’re looking for a article author for your blog.
    You have some really good articles and I feel I would be a good asset.
    If you ever want to take some of the load off, I’d love to write some articles
    for your blog in exchange for a link back to mine. Please send me an email if interested.
    Regards! 31muvXS cheap flights

    0
  7. Today, while I was at work, my sister stole my iphone and
    tested to see if it can survive a 40 foot drop, just
    so she can be a youtube sensation. My iPad is now destroyed
    and she has 83 views. I know this is entirely off topic but I had to
    share it with someone!

    0
  8. Hi there just wanted to give you a quick heads up.
    The words in your content seem to be running off the screen in Internet explorer.
    I’m not sure if this is a format issue or something to do with internet browser
    compatibility but I thought I’d post to let you know.

    The layout look great though! Hope you get the issue fixed soon. Cheers adreamoftrains web
    host

    0
  9. hello!,I really like your writing so so much! proportion we communicate extra about
    your post on AOL? I need an expert in this house to unravel my problem.

    May be that’s you! Having a look forward to look you.

    0

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *